বাংলাদেশের মানবিক ও বহুসাংস্কৃতিক চেতনার ওপর আঘাত: বাউল, লোকসংস্কৃতি ও মুক্তচিন্তার বিরুদ্ধে উগ্রবাদী নিপীড়ন

বাংলাদেশ একটি বহুমত, বহু-সংস্কৃতি ও মানবিক চেতনায় গড়া দেশ। এই দেশের ইতিহাস, আত্মা ও প্রাণশক্তি কোনো একক মতাদর্শ বা সংকীর্ণ চিন্তার ভেতর সীমাবদ্ধ নয়; বরং তা গড়ে উঠেছে সহাবস্থান, সহনশীলতা ও বৈচিত্র্যের দীর্ঘ ঐতিহ্যের ওপর। বাংলার মাটি যুগে যুগে জন্ম দিয়েছে বাউলদের মুক্তচিন্তা, লোকসংগীতের গভীর জীবনবোধ, মরমী ফকিরদের আত্মানুসন্ধানী দর্শন এবং নানা ধর্ম, জাতি ও মতের মানুষের সম্মিলিত সাংস্কৃতিক চর্চা। এই শিকড় থেকেই বাংলাদেশ তার মানবিক পরিচয় পেয়েছে।

কিন্তু গভীর উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করা যাচ্ছে, সেই দেশেই আজ বাউল শিল্পী, লোকশিল্পী, সংস্কৃতিকর্মী এবং ভিন্নমত-পোষণকারী মানুষরা ক্রমাগত হামলা, হুমকি, অপমান ও সামাজিক চাপে নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন। এটি কেবল কিছু ব্যক্তির ওপর আঘাত নয়; এটি মানবিকতা, সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ওপর সরাসরি আঘাত।

বিগত কয়েক বছরে বারবার দেখা গেছে, দেশের কিছু উগ্রপন্থী ধারার অনুসারী যাদের মধ্যে জামায়াত শিবির, হেফাজতে ইসলামসহ বিভিন্ন ধর্মীয়-রাজনৈতিক সংগঠনের প্রভাবকেন্দ্রিক গোষ্ঠীর অংশবিশেষ রয়েছে বাউল সংগীত, লোকসংস্কৃতি ও মুক্তচিন্তার চর্চাকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে “ধর্মবিরোধী” বা “অপসংস্কৃতি” আখ্যা দিয়ে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করছে। কখনো তারা অনুষ্ঠান বন্ধ করার জন্য প্রশাসন বা আয়োজকদের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে, কখনো সরাসরি শিল্পীদের ওপর হামলা চালিয়েছে, আবার কখনো মামলা, সামাজিক বয়কট বা অনলাইন আক্রমণের মাধ্যমে ভয়ের পরিবেশ তৈরি করেছে।

এই ভয় ও দমন-পীড়নের সংস্কৃতি সমাজকে নীরব করে দেওয়ার একটি কৌশল যেখানে মানুষ নিজের কথা বলতে ভয় পায়, গান গাইতে ভয় পায়, নিজের বিশ্বাস ও ভাবনা প্রকাশ করতে সংকোচ বোধ করে। কিন্তু একটি সুস্থ, গণতান্ত্রিক ও মানবিক সমাজ কখনো ভয় দিয়ে গড়া যায় না।

বাউলরা রাষ্ট্রবিরোধী নন, তারা কোনো ধর্ম বা মানুষের শত্রুও নন। তারা ক্ষমতার রাজনীতির ধারক নন, সহিংসতার ভাষায় বিশ্বাসী নন। বরং বাউল দর্শন মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখতে শেখায়, নিজের ভেতরের মানুষকে খুঁজে পেতে উদ্বুদ্ধ করে। লালনের ভাষায় “মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি” এই দর্শন বিভাজন নয়, সংযোগের কথা বলে; ঘৃণা নয়, ভালোবাসার কথা বলে।

অথচ ধর্মের নাম ব্যবহার করে কিছু উগ্রমতাবলম্বী গোষ্ঠীর অংশবিশেষ এই মানবিক দর্শনের ওপর আক্রমণ চালাচ্ছে। তারা ধর্মকে ব্যবহার করছে দমন-পীড়নের হাতিয়ার হিসেবে, যা ধর্মের মূল শিক্ষা—ন্যায়, সহমর্মিতা, সহনশীলতা ও মানবিকতার সঙ্গে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক। এই ধরনের আচরণ কোনো ধর্ম, কোনো নৈতিকতা কিংবা কোনো সভ্য সমাজই সমর্থন করে না।

এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে শুধু শিল্পী বা সংস্কৃতিকর্মীরাই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন না; ক্ষতিগ্রস্ত হবে পুরো জাতি। কারণ সংস্কৃতি ও মুক্তচিন্তা ছাড়া একটি জাতি ধীরে ধীরে আত্মাহীন হয়ে পড়ে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে সমাজে গান থেমে যায়, প্রশ্ন করা নিষিদ্ধ হয়, সেখানে অন্ধকার দীর্ঘস্থায়ী হয়।

বাংলাদেশ কোনো সংকীর্ণ মতাদর্শের দেশ নয়। এ দেশ লালন ফকিরের মানবধর্মের দেশ, শাহ আব্দুল করিমের জীবনঘনিষ্ঠ গানের দেশ, হাছন রাজার আত্মদর্শনের দেশ। এ দেশ রবীন্দ্রনাথের উদার মানবতাবাদ, কাজী নজরুল ইসলামের বিদ্রোহী সাম্যবাদের দেশ। এই দেশের শক্তির উৎস কখনো ঘৃণা, ভীতি বা দমন নয় এই দেশের শক্তির উৎস মানবতা, বহুত্ববাদ এবং মুক্তচিন্তা।

তাই বাউল, লোকশিল্পী ও ভিন্নমত পোষণকারী মানুষের ওপর হামলা মানে শুধু কিছু মানুষকে চুপ করিয়ে দেওয়া নয়; এটি বাংলাদেশের আত্মার ওপর আঘাত। এই আঘাতের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো শুধু শিল্পীদের দায়িত্ব নয়—এটি সমাজ, রাষ্ট্র ও প্রতিটি সচেতন মানুষের নৈতিক দায়িত্ব। কারণ বাংলাদেশকে বাঁচাতে হলে, তার গান, তার প্রশ্ন, তার মানবিক চেতনাকেই সবার আগে রক্ষা করতে হবে।

About the author

MD AL AMIN

A self-proclaimed freethinker, MD AL AMIN has never shied away from questioning conventional wisdom and challenging the status quo. His ability to think critically and independently has made him a respected figure in various online communities, where he engages in thought-provoking discussions and encourages others to do the same.

View all posts

8 Comments

  • তুমি কি বাংলাদেশের সেন্টিমেন্টাল ও সংস্কৃতি নিয়ে লিখতে ভয় পাও না?যদি কখনো তুমি বাংলাদেশে ফিরে আসো. তোমার বুকের ভিতরে চাকু ঢুকিয়ে তোমাকে হত্যা করা হবে. এখনো সময় আছে ভালো হয়ে যাও

  • দেশে আয়, তোকে কুপিয়ে কুপিয়ে মারব আর তোর রক্ত দিয়ে দেশে কে পরিস্কার করব। তোর মত মুনাফেকের স্থান নেই আমাদের দেশে।।

  • বাউল ধর্মের নিপাত যাক, সাথে তোর মত মুনাফেকের নিপাত যাক।

  • তুই দেখি মুসলিম নামের কলংক, বাউল সংস্কৃতির নামে যা চলে তার কোন অস্তিত্ব থাকবে না বাংলাদেশ। এগুলো সব মুনাফেকি আর তোর মত মুনাফেকের স্থান নেই বাংলাদেশে।। তুই যদি কোনদিন বাংলাদেশ আসিস তোকে মেরে বাংলাদেশ পরিস্কার করব, ইন শা আল্লাহ!!

  • হাদীর কি অবস্থা দেখছিস, তুই ত কিছুই না সে হিসাবে চুনুপুটি। তোকে হত্যা করা কোন ব্যাপার না খালি দেশে আয় একবার।

  • তোরে যেদিন বাংলাদেশে পাবো, সেদিন তোর জীবনের শেষ দিন।

  • প্রথম আলো অফিস দেখছিস, তুই ত মাছির সাইজের ব্লগার। তোকে পায়ের নিচে পিসে মেরে ফেলতে আমাদের সময় লাগবে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *