পুতুল ভাঙা–গড়ার উৎসব, রাষ্ট্রীয় মৌলবাদ ও বাংলাদেশের সংখ্যালঘু নিধনের রাজনৈতিক নীলনকশা

আর খুব বেশি সময় নেই। আবার আসছে বাঙালির বহুল আলোচিত পুতুল ভাঙা গড়ার উৎসব। সংখ্যাগুরু বাঙালি সমাজ একে বলে “সর্বজনীন উৎসব”, আবার সংখ্যালঘু হিন্দুরা একে শারদীয় দুর্গাপূজা বলে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করে। কিন্তু বাস্তবতা হলো এই ভূখণ্ডে উৎসব কখনোই নিরীহ নয়। প্রতিটি উৎসব, প্রতিটি ধর্মীয় উপলক্ষ এখানে সংখ্যালঘু নিধনের সম্ভাব্য ট্রিগার। এই দেশে উৎসব মানেই সংখ্যালঘুদের জন্য আতঙ্ক, অনিশ্চয়তা আর সম্ভাব্য ধ্বংসের কাউন্টডাউন।

বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন আর “ঘটনা” নয় এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় প্রক্রিয়া। হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান কিংবা আদিবাসী কারোর জন্যই এই রাষ্ট্র নিরাপদ নয়। যারা এখনও এসবকে “বিচ্ছিন্ন ঘটনা” বলে চালাতে চান, তারা হয় রাজনৈতিক দালাল, নয়তো নৈতিকভাবে মৃত।

২০১২ সালে কক্সবাজারের রামুতে কী ঘটেছিল, আমরা সবাই জানি। কুরআন অবমাননার একটি সম্পূর্ণ বানানো ফেসবুক পোস্টকে অজুহাত বানিয়ে রাষ্ট্রের নাকের ডগায় বৌদ্ধ বসতিতে আগুন দেওয়া হয়েছিল। ছয়টি বৌদ্ধ বিহার, বিশটির বেশি বাড়ি, শতাধিক বসতি সব পুড়িয়ে দেওয়া হলো। প্রশাসন ছিল দর্শক, রাষ্ট্র ছিল নীরব, আর মৌলবাদী জনতা ছিল উল্লসিত।
এটা কোনো “হঠাৎ উত্তেজনা” ছিল না এটা ছিল পরিকল্পিত সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস
(সূত্র: দৈনিক সংগ্রাম, ১ অক্টোবর ২০১২)

২০১৬ সালে সেই একই স্ক্রিপ্ট, সেই একই নাটক—নাসিরনগর। একজন নিরক্ষর জেলে রসরাজ দাসকে ফেসবুক পোস্টের অভিযোগে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হলো। হেফাজত-আহলে হাদিসের ব্যানারে তৌহিদী জনতা শতাধিক হিন্দু বাড়ি ও মন্দিরে হামলা চালাল। লুটপাট, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ—সবই ঘটল দিনের আলোয়। পরে দু-চারজনকে গ্রেফতার দেখিয়ে রাষ্ট্র তার দায়িত্ব শেষ করল, আর মৌলবাদীদের “সংখ্যাগুরু ভাই”দের বাঁচাতে মামলার আসামিদের জামিন দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হলো।

এখানেই শেষ নয়। রংপুরের গঙ্গাচড়া, পাবনার সাঁথিয়া, যশোরের অভয়নগর, দেবীগঞ্জ, রাণীশংকৈল—এই নামগুলো আজ একটি ধারাবাহিক গণহিংসার মানচিত্র। প্রতিবার একই অভিযোগ—ধর্ম অবমাননা। প্রতিবার একই ফল—সংখ্যালঘুর ঘর পুড়ে ছাই, নারীর নিরাপত্তা ভূলুণ্ঠিত, জমি দখল, পরিবার উচ্ছেদ।

আজ ধর্ম অবমাননার অভিযোগ এই রাষ্ট্রে সবচেয়ে সস্তা অথচ সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র। এটি দিয়ে জমি দখল হয়, নারী ধর্ষণ ঢেকে দেওয়া হয়, গোটা সম্প্রদায়কে উচ্ছেদ করা হয়। শ্যামল কান্তি হোক কিংবা রসরাজ দাস—এই দেশে সংখ্যালঘু হওয়াটাই এখন অপরাধ।

বাংলাদেশের মৌলবাদীরা আজ বিশ্বব্যাপী কুখ্যাত, কারণ তারা দেখিয়েছে কীভাবে রাষ্ট্রীয় প্রশ্রয়ে, মিথ্যা অভিযোগ দিয়ে, গণহিংসাকে বৈধতা দেওয়া যায়
(সূত্র: বিবিসি বাংলা, ১৩ নভেম্বর ২০১৭)

অথচ ১৯৭১-পরবর্তী বাংলাদেশ এমন ছিল না। স্বাধীনতার পর সংবিধান দাঁড়িয়েছিল চারটি মূলনীতির ওপর—জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা। আজ এই চারটি শব্দ কেবল রাজনৈতিক ভণ্ডামির আলংকারিক উপাদান। বাস্তবে বাংলাদেশ এখন একটি ডি-ফ্যাক্টো সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র

ক্ষমতার মোহে রাজনৈতিক দলগুলো মৌলবাদীদের কাছে নিজেদের বিক্রি করেছে। সংবিধান কাটাছেঁড়া করে রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র ধ্বংস করা হয়েছে। মৌলবাদী সংগঠনকে খাস জমি, কোটি কোটি টাকার অনুদান, শিক্ষাব্যবস্থার পূর্ণ ইসলামিকরণ—সবই রাষ্ট্রীয় মদদের ফল।

আজকের শিক্ষাব্যবস্থা আর মানুষ তৈরি করছে না; তৈরি করছে ঘৃণাপ্রবণ, একমাত্রিক চিন্তাধারার সৈনিক। মাদ্রাসা আর তথাকথিত ইসলামিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অমুসলিমদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ আর অবমাননাকে নৈতিকতা হিসেবে শেখানো হচ্ছে। এই বিষ এখন পরিবারে, সমাজে, সংস্কৃতিতে ছড়িয়ে পড়েছে।

সবচেয়ে বিপজ্জনক সত্য হলো—মৌলবাদ এখন আর আলাদা করে চেনা যায় না। এটি ঢুকে পড়েছে সাংস্কৃতিক সংগঠন, বামপন্থী মঞ্চ, প্রগতিশীলতার মুখোশের আড়ালে। যাদের আমরা “চেতনাজীবী” বলে জানি, তাদের বড় অংশই সুবিধাবাদী, ভণ্ড ও নৈতিক কাপুরুষ।

প্রিয়া সাহার ঘটনা এই সুশীল সমাজের লুঙ্গি খুলে দিয়েছে। শফি হুজুর আর অনেক তথাকথিত প্রগতিশীলের পার্থক্য এখন কেবল ভাষার ভঙ্গিতে।

রোহিঙ্গা প্রসঙ্গে “মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশ—সাম্প্রদায়িক সহিংসতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াও” স্লোগান লিখলেই এদের গায়ে জ্বালা ধরে। কারণ তারা মিয়ানমারে মানবতা দেখে না—দেখে “ইসলামিজম”। তাই তারা সিরিয়া, রোহিঙ্গা নিয়ে কাঁদে, কিন্তু ইয়েমেন নিয়ে চুপ থাকে। তারা শিশু আয়ানের মৃত্যুতে আবেগে ভাসে, কিন্তু ভোলার পূর্ণিমা, সংখ্যালঘু নারীর ধর্ষণ, আদিবাসীর উচ্ছেদে নির্বিকার থাকে।

এটাই বাংলাদেশের প্রকৃত সংকট
নির্বাচিত মানবতা, সুবিধাবাদী প্রগতিশীলতা আর রাষ্ট্রীয় মদদে বেড়ে ওঠা মৌলবাদী ফ্যাসিবাদ।

এই রাষ্ট্র যদি এখনই তার চরিত্র বদলায় না, তবে “সংখ্যালঘু” শব্দটি খুব শিগগিরই বাংলাদেশে একটি বিলুপ্ত প্রজাতির নাম হয়ে যাবে।

About the author

MD AL AMIN

A self-proclaimed freethinker, MD AL AMIN has never shied away from questioning conventional wisdom and challenging the status quo. His ability to think critically and independently has made him a respected figure in various online communities, where he engages in thought-provoking discussions and encourages others to do the same.

View all posts

5 Comments

  • বাংলাদেশ মাটিতে মূর্তি পুজো চলবে না, সাথে তোর মত মুনাফেকের জায়গা নেই বিদেশ পালিয়েছিস বলে জীবিত আছিস! দেশে আসলে তোকে হত্যা করে গাছের ঝুলিয়ে দিবো। সবাই দেখবে আর তোর মত সাহস কেউ করবে না।।

  • আমাদের বাংলাদেশ কোন মুর্তি পুজো হবে না কোন মূর্তি অস্তিত্ব থাকবে না, ইন শা আল্লাহ! সাথে তোর মত মানুষ ও। তোর জন্য বাংলাদেশ না, বাংলাদেশ আসলে তোর লাশ ফেলে দিবো, মুর্তির মত।। এইবার জয় আমাদেরই হবে, “আল্লাহ হু আকবার”

  • তোরে দেশে পাইলে ন্যাংটা করে ঝুলিয়ে পিটাইয়া মারব, নাস্তিককোথাকার।।

  • তোর মত বিধর্মীদের দালালের জীবিত থাকার মানে হয় না। তোকে মরতে হবে আমাদের হাতে। ইন শা আল্লাহ।।

  • হিন্দুদের দালাল, তোর বাংলাদেশে স্থান নেই। তোকে হাজারখানেক গুলিতে ঝাঝরা করে মারব।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *