নারীর অধিকার বনাম ধর্মীয় মৌলবাদ

বাংলাদেশে নারী বিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবকে ঘিরে ধর্মীয় মৌলবাদী দলগুলোর সম্মিলিত প্রতিক্রিয়া কোনো বিচ্ছিন্ন বা সাময়িক রাজনৈতিক আপত্তি নয়। এটি মূলত একটি সুসংগঠিত, দীর্ঘমেয়াদি এবং আদর্শিক আক্রমণ যার লক্ষ্য নারীর ব্যক্তি-স্বাধীনতা, মানবাধিকার, নাগরিক মর্যাদা এবং রাজনৈতিক অস্তিত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করা। এই প্রতিক্রিয়া একটি কমিশনের প্রতিবেদন বা কিছু নীতিগত সুপারিশের বিরোধিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি নারীর উপর রাষ্ট্র, সমাজ ও ধর্মের যৌথ নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা।

তাদের বহুল ব্যবহৃত “শরিয়াবিরোধী” বুলিটি আজ আর নিছক ধর্মীয় মতামত নয় এটি একটি রাজনৈতিক ভাষা, যার মাধ্যমে নারীর সম্পত্তির অধিকার, সম্মতির অধিকার, নিজের শরীরের উপর কর্তৃত্ব, পেশা নির্বাচনের স্বাধীনতা এবং সন্তানধারণ সংক্রান্ত সিদ্ধান্তকে অস্বীকার করা হয়। এই ভাষা নারীর মানুষ হিসেবে স্বীকৃতিকে অস্বীকার করে, এবং তাকে পরিবার ও সমাজের অধীন এক ‘নিয়ন্ত্রিত সত্তা’তে পরিণত করে।

কিন্তু আমরা ভুলে যাই না এই দেশের ইতিহাস কেবল রাষ্ট্র গঠনের ইতিহাস নয়, এটি মর্যাদা ও ন্যায়ের ইতিহাস। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ শুধু ভৌগোলিক স্বাধীনতার সংগ্রাম ছিল না; তা ছিল মানুষের মর্যাদা পুনরুদ্ধারের শপথ, নারীর সম্মান রক্ষার অঙ্গীকার এবং বৈষম্যহীন সমাজ গঠনের প্রত্যয়। সেই শপথের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো মানেই ইতিহাসের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো।

আমাদের জুলাই বিপ্লবও ছিল সেই ধারাবাহিকতারই অংশ একটি বৈষম্যহীন, সমতা-ভিত্তিক, মানবিক রাষ্ট্র গড়ার আকাঙ্ক্ষা, যেখানে লিঙ্গ, ধর্ম, বর্ণ, শ্রেণি কিংবা পেশা নির্বিশেষে সকল মানুষ মানুষ হিসেবে তার পূর্ণ মর্যাদা, ন্যায্যতা ও অধিকার পাবে। আজ ধর্মীয় মৌলবাদীদের নারীবিরোধী অবস্থান সরাসরি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, সংবিধানের মৌলনীতি, প্রচলিত আইন এবং জুলাই বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষার পরিপন্থী।

এই গোষ্ঠীগুলো ইসলাম ও সংস্কৃতির নামে নারীর অধিকার হরণ করতে চায়। তারা নারীর সমতা ও স্বাধীনতাকে ‘পশ্চিমা ভাবনা’ বলে খারিজ করে দেয়। কিন্তু আমরা স্পষ্টভাবে বলি—এটি কোনো ধর্মের সঙ্গে দ্বন্দ্ব নয়। এটি একটি মৌলিক সংঘাত: পুরুষতন্ত্র বনাম ন্যায়বিচার।

নারীর ভূমি ও সম্পত্তির অধিকার: ন্যায়বিচারের অপরিহার্য ভিত্তি

বাংলাদেশে নারী আজও উত্তরাধিকার, ভূমি ও সম্পদের মালিকানায় প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক বৈষম্যের শিকার। ইসলামি শরিয়ার নামে অপব্যাখ্যা দিয়ে বলা হয়, নারী পৈতৃক সম্পত্তির ‘অর্ধেক’ পাবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো অর্ধেক তো দূরের কথা, অধিকাংশ নারী তাদের ন্যায্য অংশ থেকেও সম্পূর্ণভাবে বঞ্চিত। সামাজিক চাপ, পারিবারিক ভয়, আইনি জটিলতা এবং সহিংসতার আশঙ্কায় তারা দাবি করতেই পারে না।

আমাদের প্রশ্ন নারী যখনই জমি বা সম্পত্তির অধিকার দাবি করেন, তখনই শরিয়ার কথা সামনে আসে কেন? দুর্নীতি, বহুবিবাহ, যৌতুক, নারী নির্যাতন, বা পুরুষ কর্তৃত্বে পরিচালিত অন্যায্যতার সময় এই শরিয়া কোথায় থাকে?

ভূমি শুধু একটি অর্থনৈতিক সম্পদ নয় এটি ক্ষমতা, আত্মনির্ভরতা, নিরাপত্তা ও মর্যাদার প্রতীক। একজন নারী যদি নিজের নামে জমির মালিক না হতে পারেন, তবে তার জীবনের উপর তার পূর্ণ কর্তৃত্ব কীভাবে সম্ভব? ভূমির উপর নারীর পূর্ণ অধিকার নারীর মানবাধিকার, এবং তা ইসলামী ন্যায়বোধের সঙ্গেও অসঙ্গতিপূর্ণ নয়। মৌলবাদীরা যখন নারীকে ভূমি, সম্পদ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা থেকে বঞ্চিত করতে চায়, তখন তারা ধর্মের অপব্যবহার করে পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতা কাঠামো রক্ষা করে।

সম্মতি, বৈবাহিক ধর্ষণ ও সহিংসতার রাজনীতি

সম্মতি ছাড়া যে কোনো সম্পর্কই সহিংসতা। বৈবাহিক সম্পর্কের মধ্যেও ধর্ষণ হয় এটি একটি অস্বীকারযোগ্য বাস্তবতা নয়, বরং নারীর দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার অংশ। অথচ বাংলাদেশের আইন এখনো বৈবাহিক ধর্ষণকে অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না। এই আইনি ফাঁক নারীর শারীরিক স্বাধিকারকে অস্বীকার করে এবং সহিংসতাকে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় বৈধতা দেয়।

ধর্মীয় গোঁড়ারা বলেন, “বিয়ের মধ্যে ধর্ষণ হয় না।” এই বক্তব্য শুধু ভুল নয় এটি পিতৃতন্ত্রের চূড়ান্ত প্রকাশ, যেখানে নারীর শরীরকে স্বামীর সম্পত্তি হিসেবে কল্পনা করা হয়। যে সমাজ বৈবাহিক ধর্ষণকে ‘স্বাভাবিক’ বলে মেনে নেয়, সে সমাজ নারীকে মানুষ নয়, মালিকানাধীন বস্তু হিসেবে বিবেচনা করে।

সংসার মানে কর্তৃত্ব নয় সংসার মানে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সম্মতি ও সহযোগিতা। স্ত্রী মানে অধীন কেউ নন; তিনি সমান মর্যাদার পূর্ণাঙ্গ সঙ্গী। তাই নারীর সম্মতি ছাড়া যে কোনো যৌন সম্পর্ক বৈবাহিক হোক বা অবৈবাহিক তা ধর্ষণ, তা সহিংসতা, এবং তা অপরাধ।

প্রজনন স্বাস্থ্য অধিকার (SRHR): নিজের শরীরের উপর নিজের সিদ্ধান্ত

একজন নারী কখন সন্তান নেবেন, নেবেন না, জন্মনিয়ন্ত্রণ ব্যবহার করবেন কি না, কিংবা গর্ভপাত করবেন কি না এই প্রতিটি সিদ্ধান্ত একমাত্র তার নিজের। তার শরীর, তার স্বাস্থ্য, তার ভবিষ্যৎ এসব বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তদাতা হবেন তিনি নিজেই।

নিরাপদ গর্ভপাত, আধুনিক জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির সহজলভ্যতা এবং তথ্যভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা নারীর জীবনের নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। যেখানে এই অধিকারগুলো নেই, সেখানে অনিরাপদ গর্ভপাত, মাতৃমৃত্যু, শারীরিক ক্ষতি ও সহিংসতার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।

তবুও ধর্ম ও তথাকথিত ‘জাতীয় সংস্কৃতি’র নামে এই অধিকারগুলো বারবার প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়। মৌলবাদী গোষ্ঠীগুলো নারীর জরায়ুকে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের অস্ত্রে পরিণত করতে চায়। আমরা স্পষ্ট করে বলি—নারীর শরীর তার নিজের। কোনো ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, রাষ্ট্র বা পরিবার এর মালিক নয়। নারীর জরায়ু কোনো ‘জাতীয় সম্মানের প্রতীক’ নয়; এটি একটি ব্যক্তিগত শরীর, যার উপর নারীর একচ্ছত্র অধিকার থাকতে হবে।

যৌনকর্ম ও শ্রমের স্বীকৃতি: মর্যাদার প্রশ্ন

যৌনকর্মকে ‘কাজ’ হিসেবে স্বীকৃতি না দেওয়া মানে লক্ষ লক্ষ নারীর শ্রম, বেঁচে থাকার লড়াই এবং মানবাধিকারকে অস্বীকার করা। যে শ্রমের বিনিময়ে আয় হয়, ঝুঁকি থাকে এবং শারীরিক-মানসিক শ্রম ব্যয় হয়—তা কাজই। যৌনকর্ম এই সংজ্ঞার বাইরে নয়।

যৌনকর্মকে কাজ হিসেবে স্বীকৃতি না দিলে যৌনকর্মী নারী শ্রমিক নন তিনি অপরাধীতে পরিণত হন। তখন তার আইনি সুরক্ষা থাকে না, স্বাস্থ্যসেবার অধিকার থাকে না, সামাজিক মর্যাদাও থাকে না। এটি নারীর শ্রম ও যৌনতা দুটোকেই অস্বীকার করার শামিল।

বহু দেশে যৌনকর্মকে শ্রম হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে আইনি সুরক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও মর্যাদা নিশ্চিত করা হয়েছে। বাংলাদেশ কেন পিছিয়ে থাকবে? যৌনকর্মকে কাজ হিসেবে স্বীকৃতি না দেওয়া মানে শুধু ধর্ম বা নৈতিকতাকে নয় আমাদের সংবিধান, শ্রমনীতি এবং নারীবাদী ন্যায়বোধকেই অস্বীকার করা।

শেষ কথা: আপসহীন অবস্থান এখনই জরুরি

যারা নারীর অধিকার, সাম্য ও সামাজিক ন্যায়ে বিশ্বাস করি, তাদের এখনই আরও স্পষ্ট ও দৃঢ়ভাবে বলার সময় এসেছে নারীবিরোধী ধর্মীয় ব্যাখ্যার নামে সমাজের অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে চুপ করিয়ে রাখা যাবে না।

এই রাষ্ট্রে নারী শুধু বেঁচে থাকবে না তিনি মর্যাদায়, সম্মতিতে ও সিদ্ধান্তে পূর্ণ মানুষ হিসেবে বাঁচবেন। এটাই আমাদের ইতিহাসের দাবি, আমাদের সংবিধানের অঙ্গীকার এবং আমাদের ভবিষ্যতের শর্ত।

About the author

MD AL AMIN

A self-proclaimed freethinker, MD AL AMIN has never shied away from questioning conventional wisdom and challenging the status quo. His ability to think critically and independently has made him a respected figure in various online communities, where he engages in thought-provoking discussions and encourages others to do the same.

View all posts

18 Comments

  • তোরে পাইলে এমন কুপানি কুপামু, এমন যন্ত্রণা দিয়ে মারব যে তোর আত্নাও ভয়ে কুকড়ে যাবে।

  • তোরে দেশে এনে জ্বালিয়ে মারব রে হারামি।।

  • এই ভাবে তোরা দেশ, সংস্কৃতি, সভ্যতা আর ধর্মীয় স্থিতি নিয়ে নারীদের ম্যানুপুলেট করিস ওদের বিভ্রান্ত করিস ভোগ্যপণ্য হিসাবে তৈরি করিস। দুনিয়ায় মধ্যে জাহান্নাম সৃষ্টি করিস। একবার দেশে আয় তোকে প্রকাশ্যে ঝুলিয়ে পিটিয়ে হত্যা করব। তোর মত পাপী জায়গা নেই আমার দেশে।

  • শয়তানের আওলাদ, এগুলো করস না। পলাইছিস ত ইহুদিদের দেশে। আসবি না বাংলাদেশ, মেরে পুতে রাখব।

  • আমি নারীর মর্যাদাকে সম্মান করি, তাই আমি বলি ‘যৌনকর্মের স্বীকৃতি’। মেয়েরা হলো বস্তু! তোমরা অজাত, তাই তোমাদের মুখ থেকে এসব কথা বের হয়। তোমাদের মতো ভণ্ডদের বাঁচিয়ে রাখা যাবে না। বাংলাদেশে এসো, আমি তোকে মেরে রাস্তার কুকুরদের খাওয়াবো।

  • আর কত পন্য হিসাবে নারীদের তৈরির জন্য যড়যন্ত্র করবি। তোদের মত নাস্তিক জায়গা নেই আমার সোনার বাংলাদেশে। বিদেশ গিয়ে ভালো করেছিস, না হলে তোকে খুন করে দেশের পরিবেশ পরিস্কার করতাম।

  • রাজনীতি নিয়া লিখিস মানলাম আমার বেডি মানুষের ইস্যু নিয়ে লিখিস। তোর দেখি ফ্রি মিক্সিং জোয়ারে ভাসছিস।। তোরে ফ্রি হ্যান্ড পাইলে কুপাবো। একবার দেশে আয়।।

  • ইসলাম নারীকে সর্বোচ্চ অধিকার দিয়েছে সম্মান দিয়েছে। তুই আসছিস জ্ঞান দিতে, তোর জ্ঞান তোর কাছে রাখ। তোরে পাইলে পেটে ছুরি ঢুকিয়ে চিরে ফেলব তারপর শুটকি বানাবো। সব নাস্তিক মনে রাখবে তোর এই অবস্থার কথা। এক কলম লিখতে ও ভয়ে গা শিউরে উঠবে।।

  • অধিকারের নামে উশৃঙ্খল জীবনে শ্লোগান দেস। তোদের জন্য সমাজের এই অবস্থা। নারী লোভী পুরুষ তোরা। তোকে জিন্দা কবর দিবো।

  • লাতির ভুত, কথায় মানে না। তোরে মেরে পিস পিস করে কাক কে খাওয়াবো চিল, শকুন কে খাওয়াবো।

  • মেয়েদের কিভাবে ভোগ্য বস্তু বানাই রাখবি এই ধান্দা তোর তাই এগুলো লিখিস। তোর হাত কেটে ফেলব।

  • তোর মরন ঘনিয়ে আসছে, খালি দেশে আয়। তোর লাশ খুঁজে পাবে না কেউ।।

  • তোরা নারী সমাজ কে প্রলোভন দেখিয়ে নষ্ট করছিস, তোদের জায়গা জাহান্নামে।।

  • দেশে আয়, তুই শেষ।। লিস্টে তোর নাম আগে আছে।

  • তোর ক্রসফায়ারে দিয়ে মারা দরকার।তোর মত নাস্তিকের স্থান নাই বাংলাদেশে।

  • ফ্রি মিক্সিং, বন্ধু, প্রেম ভালোবাসার নামে তোরা মেয়েদের লোভ দেখাস, নষ্ট করিস, মেয়েদের কি খেলনা মনে করিস। সুশীল সমাজের নামে, বেইশ্যাবৃত্তি প্রমোট করিস। তোরে মাইরা চিল আর কুত্তারে খাওয়ামু।

  • আগে আর পরে দেশে ত আসবি, আসলে তুই খালাস করে দিবো।

  • কি সব আবল তাবল ভুং ভাং বুঝাছিস নারী সমাজ কে। দুনিয়াতে নারী এসেছে সন্তান ধারন আর লালন পালন আর মুসলিম জাতির বংশ বৃদ্ধি করার জন্য।। তোর মত কুলাংারের জন্য নারীরা পথভষ্ট হয়। তাই তোর জায়গা দেশে হবে না, দেশে আসলে খুলি উড়িয়ে দিবো।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *